BREAKING NEWS
GMT+2 04:10

সাইয়্যিদুল আইয়াদ জিন্দাবাদ , আবাদুল আবাদ

সারা বছর, চিরদিনই সাইয়্যিদুল আইয়াদ পালন করতে হবে। এর রয়েছে বেমেছাল ফযীলত ।

11393102_401880403339035_7122064461864688921_n

ঈদু মীলাদিন নাবিইয়ি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপনের বেমেছাল ফাযায়িল-ফযীলতসমূহ:

‘মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’-এ সংযুক্ত শব্দ মুবারক-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ:

‘ঈদ’ অর্র্থ হচ্ছে খুশি বা আনন্দ প্রকাশ করা। আর ‘মীলাদ’ অর্র্থ জন্মের সময় বা দিন। النبى (আন নাবিইয়্যু) শব্দ দ্বারা নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকেই বুঝানো হয়।

কাজেই আভিধানিক অর্থে عيد ميلاد النبى (ঈদু মীলাদিন নাবিইয়ি) বলতে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ-এর দিন উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করাকেই বুঝায়। আর পারিভাষিক অর্থে ‘ঈদে মীলাদুন নবী’ বলতে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ-এর দিবস উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করা, উনার ছানা-ছিফত, ফাযায়িল-ফযীলত, শান-মান বর্ণনা করা, উনার প্রতি ছলাত-সালাম ও তাসবীহ-তাহলীল পাঠ করা, উনার পূতপবিত্রতম জীবনী মুবারক-এর সামগ্রিক বিষয়ের আলোচনাকেই বুঝায়।

মহান আল্লাহ পাক তিনি আলমে আরওয়াহতে সমস্ত নবী-রসূলআলাইহিমুস সালাম উনাদেরকে নিয়ে ঈদে মীলাদুন নবীছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপন করেছেন

মহান আল্লাহ পাক তিনি আলমে আরওয়াহতেই সমস্ত নবী রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকে একত্রিত করে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ তথা আগমন শরীফ-এর মহান খুশির খোশখবরী জানিয়ে দেন এবং উনার প্রতি ঈমান আনয়ন ও সার্বিক খিদমত ফরয করে তার যথাযোগ্য ওয়াদা নেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক তিনি কুরআন শরীফ-এ ইরশাদ করেন-

واذ اخذ الله ميثاق النبين لما اتيتكم من كتاب وحكمة ثم جائكم رسول مصدق لما معكم لتؤمنن به ولتنصرنه قال اأقررتم واخذتم على ذلكم اصرى قالوا اقررنا قال فاشهدوا وانا معكم من الشاهدين. فمن تولى بعد ذلك فاولئك هم الفاسقون.

অর্থ: “(হে আমার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি স্মরণ করুন সেই সময়ের কথা) যখন মহান আল্লাহ পাক তিনি (আলমে আরওয়াহতে) সমস্ত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের কাছ থেকে ওয়াদা নিয়েছিলেন যে, আপনাদেরকে আমি কিতাব ও হিকমত দান করবো। অতঃপর আপনাদেরকে সত্য প্রতিপাদনের জন্য (নুবুওওয়াত ও রিসালতের হাক্বীক্বী ফায়িয দেয়ার জন্য) আখিরী নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে প্রেরণ করবো। আপনারা উনার উপর অবশ্যই অবশ্যই ঈমান আনবেন তথা উনাকে অবশ্যই অবশ্যই নবী ও রসূল হিসেবে মেনে নিবেন এবং সার্বিক বিষয়ে উনার যথাযথ খিদমত করবেন (উনার মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করবেন)। আপনারা কি এই ওয়াদার কথা মেনে নিলেন? উত্তরে সকলে বললেন, হ্যাঁ আমরা এই ওয়াদা স্বীকার করলাম (অর্থাৎ আমরা যমীনে গিয়ে আখিরী নবী হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করব)। তখন মহান আল্লাহ পাক তিনি বললেন, আপনারা সাক্ষী থাকুন, আমিও আপনাদের সাথে সাক্ষী হয়ে গেলোাম। তবে জেনে রাখুন যারা এই ওয়াদাকৃত বিষয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে (যারা ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করবে না বা এর বিরোধিতা করবে) তারা চরম পর্যায়ের ফাসিক (কাফির) হয়ে যাবে।” (সূরা আলে ইমরান- ৮১, ৮২)

মহান আল্লাহ পাক তিনি সমস্ত জিন-ইনসানসহ সমগ্র কায়িনাতবাসীকে ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপনের আদেশ দিয়েছেন

হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সমগ্র কায়িনাতের সবচেয়ে বড় রহমত, ফযল-করম এবং সর্বোত্তম নিয়ামত বিধায় উনার বিলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করা সবচেয়ে শ্রেষ্ঠতম ঈদ; যা পালন করা সমস্ত কায়িনাতবাসীর জন্য ফরযে আইন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ করেন-

يايها الناس قد جاءتكم موعظة من ربكم وشفاء لما فى الصدور وهدى ورحمة للمؤمنين. قل بفضل الله وبرحمته فبذالك فليفرحوا هو خير مما يجمعون .

অর্থ: “হে মানবজাতি! অবশ্যই তোমাদের মধ্যে মহান আল্লাহ পাক উনার পক্ষ থেকে এসেছেন মহান নছীহত স্বরূপ, তোমাদের অন্তরের সকল ব্যাধিসমূহ দূরকারী, মহান হিদায়েত ও ঈমানদারদের জন্য মহান রহমত (হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)।”

“হে হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি বলে দিন, তোমরা মহান আল্লাহ পাক উনার দয়া, ইহসান ও রহমত (হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে পেয়ে) উনার জন্য যথার্থভাবে ঈদ উদযাপন বা খুশি প্রকাশ করো। তোমরা যতো কিছুই করোনা কেনো তিনিই হচ্ছেন সমগ্র কায়িনাতের জন্য সবচেয়ে বড় ও সর্বোত্তম নিয়ামত।” (সূরা ইউনুস- ৫৭, ৫৮)

এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ করেন-

اِنَّا اَرْسَلْنٰكَ شَاهِدًا وَّمُبَشِّرًا وَّنَذِيرًا. لِّتُؤْمِنُوْا بِاللهِ وَرَسُولِه وَتُعَزِّرُوْهُ وَتُوَقِّرُوْهُ وَتُسَبِّحُوْهُ بُكْرَةً وّ َاَصِيلا.

অর্থ: “(হে আমার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারীস্বরূপ পাঠিয়েছি যেন (হে মানুষ!) তোমরা আল্লাহ তায়ালার উপর এবং উনার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উপর ঈমান আনো এবং তোমরা উনার খিদমত করো ও উনার তা’যীম-তাকরীম করো এবং উনার ছানা-ছিফত করো সকাল-সন্ধ্যা অর্থাৎ দায়িমীভাবে সদা সর্বদা।” (সূরা ফাতহ : আয়াত ৮-৯)

এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি আরো ইরশাদ করেন-

إِنَّ اللّٰهَ وَمَلائِكَتَهٗ يُصَلُّوْنَ عَلَى النَّبِىِّ يٰاَيُّهَا الَّذِينَ اٰمَنُوْا صَلُّوْا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيْمًا ۝

অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক তিনি এবং উনার ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনারা হযরত নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি ছলাত তথা দুরূদ শরীফ পাঠ করেন। হে মু’মিনগণ! তোমরাও হযরত নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি ছলাত তথা ছানা-ছিফত, তাসবীহ-তাহলীল পাঠ করো এবং সালাম প্রেরণ করো প্রেরণ করার মত।” অর্থাৎ যথাযথ তা’যীম-তাকরীমের সাথে। (সূরা আহযাব : আয়াত ৫৬)

উক্ত আয়াত শরীফগুলোর মাধ্যমে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো যে, সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ, সাইয়্যিদে ঈদে আ’যম, সাইয়্যিদে ঈদে আকবর পবিত্র ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করা সমস্ত জিন-ইনসানসহ সমগ্র কায়িনাতবাসীর জন্য ফরযে আইনের অন্তর্ভুক্ত।

নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং নিজেই নিজের বিলাদত শরীফ উপলক্ষে ঈদ পালন করেন

হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নিজেই নিজের মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালনার্থে খুশি প্রকাশ করে আরো ইরশাদ করেন-

انى دعوت ابراهيم عليه السلام وبشارة عيسى عليه السلام ورؤيا امى التى رأت حين وضعتنى وقد خرج لها نور اضائت لها منه قصور الشام.

অর্থ: “আমি হলাম হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার দোয়া, হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম উনার সুসংবাদ এবং আমার আম্মাজান হযরত আমিনা আলাইহাস সালাম উনার দেখা সুস্বপ্ন মুবারক ও অলৌকিক ঘটনার বাস্তব প্রতিফলন। আমার আম্মাজান আলাইহাস সালাম তিনি আমার বিলাদত শরীফ-এর সময় দেখেছিলেন যে, এক খ- বরকতময় ‘নূর’ যমীনে তাশরীফ নিলেন এবং সে নূর মুবারক-এর আলোর প্রভাবে শাম দেশের দালান-কোঠাগুলোকে আলোকিত করলো তা তিনি সুস্পষ্টভাবে দেখতে পেলেন।” সুবহানাল্লাহ!(মুসনাদে আহমদ, মিশকাত শরীফ)

এছাড়া সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং নিজেও নিজের মীলাদ শরীফ তথা বিলাদত শরীফ সম্পর্কে খুশি প্রকাশ করে স্বীয় বংশ মর্যাদার ছানা-ছিফত বর্ণনা করেন,

عن العباس رضى الله تعالى عنه قال قال النبى صلى الله عليه و سلم فجعلنى فى خيرهم قبيلة ثم جعلهم بيوتا فجعلنى فى خيرهم بيتا فانا خيرهم نفسا وخيرهم بيتا.

অর্থ: “….মহান আল্লাহ তায়ালা তিনি আমাকে কুল-মাখলুকাতের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম, মাখলুকাতের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম গোত্র কুরাঈশ খান্দানে এবং কুরাঈশ গোত্রের বিভিন্ন শাখার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হাশেমী শাখায় এবং মহান আল্লাহ পাক উনার কায়িনাতে সর্বশ্রেষ্ঠ ঘরে আমাকে প্রেরণ করেছেন।” সুবহানাল্লাহ! (তিরমিযী, মিশকাত শরীফ)

নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নিজেই মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাহফিলে উপস্থিত হয়ে খুশি প্রকাশ করে বেমেছাল ফযীলত ও নাজাতের সুসংবাদ প্রদান করেন

এ মুবারক ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপনের সুমহান সুন্নত আদায় করার যে পদ্ধতি বা নিয়ম বর্তমানে জারি রয়েছে তা পরবর্তিতে কারো মনগড়া তৈরিকৃত কোনো নিয়ম-পদ্ধতি নয়। বরং এ নিয়ম স্বয়ং আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার যামানাতেই জারি ছিলো এবং হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনারা ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করেছেন। অতঃপর সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে এ নিয়ম পালিত হয়ে আসছে। এ প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে,

عَنْ اَبِى الدَّرْدَاءِ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ اَنَّه مَرَّ مَعَ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِلٰى بَيْتِ عَامِرِ الاَنْصَارِىِّ وَكَانَ يُعَلِّمُ وَقَائِعَ وِلادَتِه صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لاَبْنَائِه وَعَشِيْرَتِه وَيَقُوْلُ هٰذَا الْيَوْمَ هٰذَا الْيَوْمَ فَقَالَ عَلَيْهِ الصَّلٰوةُ وَالسَّلامُ اِنَّ اللهَ فَتَحَ لَكَ اَبْوَابَ الرَّحْمَةِ وَالْمَلائِكَةُ كُلُّهُمْ يَسْتَغْفِرُوْنَ لَكَ مَنْ فَعَلَ فِعْلَكَ نَجٰى نَجٰتَكَ.

অর্থ: হযরত আবু দারদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত আছে যে, একদা তিনি রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে হযরত আমির আনছারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার গৃহে উপস্থিত হয়ে দেখতে পেলেন যে, তিনি বিলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করে উনার সন্তানাদি এবং আত্মীয়-স্বজন, জ্ঞাতি-গোষ্ঠী, পাড়া-প্রতিবেশীদেরকে নিয়ে আখিরী রসূল হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ-এর ঘটনাসমূহ শুনাচ্ছেন এবং বলছেন, এই দিবস; এই দিবস (অর্থাৎ এই দিবসে রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যমীনে তাশরীফ এনেছেন এবং ইত্যাদি ইত্যাদি ঘটেছে)।

বিলাদত শরীফ-এর ঘটনাবলী শ্রবণ করে হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি অত্যন্ত খুশি হয়ে বললেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তিনি উনার রহমতের দরজা আপনার জন্য উন্মুক্ত করেছেন এবং সমস্ত ফেরেশতাগণ উনারা আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছেন এবং যে কেউ আপনার মতো এরূপ কাজ করবে, সেও আপনার মতো নাজাত (ফযীলত) লাভ করবে।” সুবহানাল্লাহ! (আত তানবীর ফী মাওলিদিল বাশীর ওয়ান নাযীর, সুবুলুল হুদা ফী মাওলিদিল মুস্তফা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- হযরত ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী, হাক্বীক্বতে মুহম্মদী মীলাদে আহমদী-৩৫৫ পৃষ্ঠা)

এ সম্পর্কে হাদীছ শরীফ-এ আরো ইরশাদ হয়েছে,

عَنْ اِبْنِ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُمَا اَنَّهٗ كَانَ يُحَدِّثُ ذَاتَ يَوْمٍ فِىْ بَيْتِهٖ وَقَائِعَ وِلادَتِهٖ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِقَوْمٍ ، فَيَسْتَبْشِرُوْنَ وَيُحَمِّدُوْنَ اللهَ وَيُصَلُّوْنَ عَلَيْهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاِذَا جَاءَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ حَلَّتْ لَكُمْ شَفَاعَتِىْ.

অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা বিলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করে উনার নিজগৃহে ছাহাবীগণকে সমবেত করে আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ-এর ঘটনাসমূহ শুনাচ্ছিলেন। এতে শ্রবণকারীগণ আনন্দ ও খুশি প্রকাশ করছিলেন এবং আল্লাহ পাক উনার প্রশংসা তথা তাসবীহ-তাহলীল পাঠ করছিলেন এবং আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উপর (ছলাত-সালাম) দুরূদ শরীফ পাঠ করছিলেন। এমন সময় রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তথায় উপস্থিত হয়ে বিলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করতে দেখে বললেন: “আপনাদের জন্য আমার শাফায়াত ওয়াজিব হয়ে গেলো।” সুবহানাল্লাহ! (সুবুলুল হুদা ফী মাওলিদিল মুস্তফা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- হযরত ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী)

যে মহান বিলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করলে, মীলাদ শরীফ-এর মাহফিল করলে কিংবা অন্য কোনো ছানা-ছিফত বর্ণনা করলে আমাদের শাফায়াত ও জান্নাত ওয়াজিব হয়! এটা আমাদের জন্য কতো বড় নিয়ামত! সুবহানাল্লাহ!! কাজেই আমাদের প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানী দায়িত্ব কর্তব্য হলো- টাকা-পয়সা, জান-মাল সবকিছুই দিয়ে প্রতিটি ঘরে ঘরে প্রতি মুহূর্তে ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপন উপলক্ষে যথাযথভাবে খুশি প্রকাশ করে মহান নিয়ামত হাছিল করা।

খুলাফায়ে রাশিদীন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনারা ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করার বেমেছাল ফযীলত বর্ণনা করেছেন

এ প্রসঙ্গে বিশ্ব সমাদৃত ও সুপ্রসিদ্ধ মীলাদ শরীফ-এর কিতাব “আন নি’য়ামাতুল কুবরা আলাল আলাম ফী মাওলিদি সাইয়্যিদি উলদি আদম”-এ বর্ণিত রয়েছে,

قَالَ اَبُوْ بَكْرِنِ الصِّدِِّيْقِ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ مَنْ اَنْفَقَ دِرْهَمًا عَلٰى قِرَائَةِ مَوْلِدِ النَّبِىِّ صَلّٰى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ رَفِيْقِىْ فِىْ الْجَنَّةِ.

অর্থ: (নবীদের পরে শ্রেষ্ঠ মানুষ) হযরত আবু বকর ছিদ্দীক্ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করে এক দিরহাম ব্যয় করবে, সে জান্নাতে আমার বন্ধু হয়ে থাকবে।” সুবহানাল্লাহ! (আন নি’য়ামাতুল কুবরা)

এ প্রসঙ্গে আরো বর্ণিত আছে,

وَقَالَ عُمَرُ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ مَنْ عَظَّمَ مَوْلِدَ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَدْ اَحْيَا الاِسْلامَ.

অর্থ: হযরত উমর ফারূক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তথা বিলাদত শরীফকে বিশেষ মর্যাদা দিলো অর্থাৎ এ উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করলো, সে মূলত ইসলামকেই পুনরুজ্জীবিত করলো।” সুবহানাল্লাহ! (আন নি’য়ামাতুল কুবরা)

এ প্রসঙ্গে আরো বর্ণিত আছে,

وَقَالَ عُثْمَانُ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ مَنْ اَنْفَقَ دِرْهَمًا عَلٰى قِرَائَةِ مَوْلِدِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَكَاََنَّمَا شَهِدَ غَزْوَةَ بَدْرٍ وَحُنَيْنٍ.

অর্থ: হযরত উছমান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষে খুশি হয়ে এক দিরহাম খরচ করলো, সে যেনো বদর ও হুনাইন যুদ্ধে শরীক থাকলো।” সুবহানাল্লাহ! (আন নি’য়ামাতুল কুবরা)

এ প্রসঙ্গে আরো বর্ণিত আছে-

وَقَالَ عَلِىٌّ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ وَكَرَّمَ اللهُ وَجْهَهٗ مَنْ عَظَّمَ مَوْلِدَ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَكَانَ سَبَبًا لِِّقِرَائَتِهٖ لايَخْرُجُ مِنَ الدُّنْيَا اِلا بِالاِيْمَانِ وَيَدْخُلُ الْجَنَّةَ بِغَيْرِ حِسَابٍ.

অর্থ: হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বিশেষ মর্যাদা প্রদান করলো অর্থাৎ সে উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করলো, সে ব্যক্তি অবশ্যই ঈমান নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিবে এবং বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” সুবহানাল্লাহ! (আন নি’য়ামাতুল কুবরা)

হযরত তাবিয়ীন রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ উনারাও ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করে খুশি প্রকাশ করার বেমেছাল ফযীলতের বর্ণনা দিয়েছেন

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট তাবিয়ী হযরত হাসান বছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি; যিনি শতাধিক ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের সাক্ষাৎ লাভসহ ইসলামের চতুর্থ খলীফা হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার খলীফা ও ছাত্র ছিলেন। তিনি বলেন-

وَدِدْتُّ لَوْ كَانَ لِىْ مِثْلُ جَبَلِ اُحُدٍ ذَهْبًا فَاَنْفَقْتُهٗ عَلٰى قِرَاءَةِ مَوْلِدِ النَّبِىِّ صَلّٰى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.

অর্থ: “আমার একান্ত ইচ্ছা হয় যে, আমার যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকতো তাহলে আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করে ব্যয় করতাম।” সুবহানাল্লাহ! (আন নি’য়ামাতুল কুবরা)

মাযহাব ও তরীক্বতের ইমামগণও ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করে খুশি প্রকাশ করাকে সীমাহীন ফযীলত ও নাজাতের পথ হিসেবে উল্লেখ করেছেন

শাফিয়ী মাযহাবের ইমাম হযরত ইমাম শাফিয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন,

مَنْ جَمَعَ لِمَوْلِدِ النَّبِىِّ صَلّٰى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ اِخْوَانًا وَهَيَّاَ طَعَامًا وَاَخْلٰى مَكَانًا وَعَمَلَ اِحْسَانًا وَصَارَ سَبَبًا لِقِرَائَتِهٖ بَعَثَهُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَعَ الصِّدِّيْقِيْنَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِيْنَ وَيَكُوْنُ فِىْ جَنَّاتِ النَّعِيْمِ.

অর্থ: “যে ব্যক্তি আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করার জন্য লোকজন একত্রিত করলো এবং খাদ্য তৈরি করলো ও জায়গা নির্দিষ্ট করলো এবং উত্তমভাবে (তথা সুন্নাহভিত্তিক) আমল করলো তাহলে উক্ত ব্যক্তিকে আল্লাহ পাক তিনি হাশরের দিন ছিদ্দীক্ব, শহীদ, ছালিহীনগণের সাথে উঠাবেন এবং উনার ঠিকানা হবে জান্নাতুল নায়ীমে।” সুবহানাল্লাহ! (আন নি’য়ামাতুল কুবরা)

আল্লাহ পাক উনার বিশিষ্ট ওলী হযরত ইমাম মারূফ কারখী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন,

مَنْ هَيَّأَ طَعَامًا لاَجْلِ قِرَائَةِ مَوْلِدِ النَّبِىِّ صَلّٰى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَجَمَعَ اِخْوَانًا وَاَوْقَدَ سِرَاجًا وَلبِسَ جَدِيْدًا وَتَبَخَّرَ وَتَعَطَّرَ تَعْظِيْمًا لِمَوْلِدِ النَّبِىِّ صَلّٰى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَشَرَهُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَعَ الْفِرْقَةِ الاُوْلٰى مِنَ النَّبِيّنَ وَكَانَ فِىْ اَعْلٰى عِلِّيِّيْن.

অর্থ: “যিনি আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করে খাদ্য প্রস্তুত করবেন এবং এর সম্মানার্থে মুসলমান ভাইদের একত্রিত করবেন, (আলো দানের উদ্দেশ্যে) প্রদীপ বা বাতি জ্বালাবেন, নতুন পোশাক পরিধান করবেন, (সুগন্ধির উদ্দেশ্যে) ধূপ জ্বালাবেন এবং আতর-গোলাপ মাখবেন, ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ পাক তিনি তার হাশর-নশর করবেন নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামগণ উনাদের প্রথম দলের সাথে এবং তিনি সুউচ্চ ইল্লীনে অবস্থান করবেন।” সুবহানাল্লাহ!

আল্লাহ পাক উনার খালিছ ওলী হযরত সাররী সাক্বতী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন,

مَنْ قَصَدَ مَوْضعًا يُقْرَأُ فِيْهِ مَوْلِدُ النَّبِىِّ صَلّٰى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَدْ قَصَدَ رَوْضَةً مِنْ رِيَاضِ الْجَنَّةِ لاَنَّهٗ مَا قَصَدَ ذٰلِكَ الْمَوْضعَ اِلا لِمُحَبَّةِ النَّبِىِّ صَلّٰى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.

অর্থ: “যে ব্যক্তি মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপন করার জন্য খুশি প্রকাশ করে স্থান নির্দিষ্ট করলো, সে যেনো নিজের জন্য জান্নাতে রওযা বা বাগান নির্দিষ্ট করলো। কেনোনা সে তা হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুহব্বতের জন্যেই করেছে।” (আন নি’য়ামাতুল কুবরা)

এ প্রসঙ্গে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন-

مَنْ اَحَبَّنِىْ كَانَ مَعِىَ فِى الْجَنَّةِ.

অর্থ: “যে ব্যক্তি আমাকে মুহব্বত করবে সে আমার সাথেই জান্নাতে থাকবে।” সুবহানাল্লাহ! (তিরমিযী শরীফ)

সাইয়্যিদুত ত্বয়িফা হযরত জুনাইদ বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন-

مَنْ حَضَرَ مَوْلِدَ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَعَظَّمَ قَدَرَهٗ فَقَدْ فَازَ بِالاِيْمَانِ.

অর্থ: “যে ব্যক্তি মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আয়োজনে খুশি প্রকাশ করার জন্য উপস্থিত হলো এবং উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করলো। সে তার ঈমানের দ্বারা সাফল্য লাভ করবে অর্থাৎ সে বেহেশতী হবে।” সুবহানাল্লাহ! (আন নি’য়ামাতুল কুবরা)

অনুসরণীয় ইমাম, মুজতাহিদ ও আউলিয়ায়ে কিরামগণও ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করে খুশি প্রকাশ করার বেমেছাল ফযীলত বর্ণনা করেন

বিশ্বখ্যাত আলিমে দ্বীন হযরত ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন,

قال فخر الدين الرازى رحمة الله عليه ما من شخص قرأ مولد النبى صلى الله عليه وسلم على ملح او بر او شيئ اخر من المأكولات الا ظهرت فيه البركة فى كل شيئ وصل اليه من ذلك المأكول فانه يضطرب ولا يستقر حتى يغفر الله لاكله .

অর্র্থ: “যে ব্যক্তি বিলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাহফিল উদযাপন করে লবণ, গম বা অন্য কোনো খাদ্য দ্রব্যের উপর ফুঁক দেয়, তাহলে এই খাদ্য দ্রব্যে অবশ্যই বরকত প্রকাশ পাবে। এভাবে যে কোনো কিছুর উপরই পাঠ করুক না কেনো, তাতে বরকত হবেই। উক্ত খাদ্য-দ্রব্য ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপনকারীর জন্য আল্লাহ পাক উনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, এমনকি তাকে ক্ষমা না করা পর্যন্ত সে ক্ষান্ত হয় না।” সুবহানাল্লাহ! (হাক্বীক্বতে মুহম্মদী, আন নি’য়ামাতুল কুবরা)

হযরত ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি আরো বলেন-

وَاِنْ قُرِئَ مَوْلِدُ النَّبِىِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلٰى مَاءٍ فَمَنْ شَرِبَ مِنْ ذٰلِكَ المْاَءِ دَخَلَ قَلْبَهُ اَلْفَ نُوْرٍ وَّرَحَمَةٍ وَخَرَجَ مِنْهُ اَلْفُ غِلٍّ وَعِلَّةٍ وَلايَمُوْتُ ذٰلِكَ الْقَلْبُ يَوْمَ تَمُوْتُ الْقُلُوْبُ.

অর্থ: “যদি খুশির সাথে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপন করে কোনো পানিতে ফুঁক দেয়, অতঃপর উক্ত পানি কেউ পান করে তাহলে উনার অন্তরে এক হাজার নূর ও রহমত প্রবেশ করবে। আর উনার থেকে হাজারটি বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ রোগ দূর হবে যে দিন সমস্ত ক্বলব (মানুষ) মৃত্যুবরণ করবে সেদিনও ওই মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পানি পানকারী ব্যক্তির অন্তর মৃত্যুবরণ করবেনা।” সুবহানাল্লাহ! (আন নি’য়ামাতুল কুবরা)

হযরত ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি আরো বলেন-

وَمَنْ قَرَأَ مَوْلِدَ النَّبِىِّ صَلّٰى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلٰى دَرَاهِمَ مَسْكُوْكَةٍ فِضَّةٍ كَانَتْ اَوْ ذَهَبًا وَخَلَطَ تِلْكَ الدَّرَاهِم بِغَيْرِهَا وَقَعَتْ فِيْهَا الْبَرْكَةُ وَلا يَفْتَقِرُ صَاحِبُهَا وَلا تَفْرُغُ يَدُهٗ بِبَرْكَةِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَمَ.

অর্থ: “যে ব্যক্তি খুশির সাথে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপন করে রৌপ্যের অথবা স্বর্ণের দিরহামসমূহের উপর ফুঁক দেয় অতঃপর তা অন্য জাতীয় মুদ্রার সাথে মিশায় তাহলে তাতে অবশ্যই বরকত হবে এবং এর পাঠক কখনই ফকীর হবে না। আর উক্ত পাঠকের হাত নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বরকতে কখনো খালি হবে না।” সুবহানাল্লাহ! (আন নি’য়ামাতুল কুবরা)

মুসলিম বিশ্বে যিনি সবচেয়ে বেশি কিতাব লিখেছেন, যিনি হিজরী দশম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ ও ইমাম, সুলত্বানুল আরিফীন হযরত জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন-

مَا مِنْ مُسْلِمٍ قَرَاَ فِىْ بَيْتِهٖ مَوْلِدَ النَّبِىِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِلا رَفَعَ اللهُ سُبْحَانَهٗ وَتَعَالٰى اَلْقَحَطَ وَالْوَبَاءَ وَالْحَرْقَ وَالْغَرَقَ وَالاَفَاتِ وَالْبَلِيَّاتِ وَالْبَغْضَ وَالْحَسَدَ وَعَيْنَ السُّوْءِ وَاللُّصُوْصِ عَنْ اَهْلِ ذٰلِكَ الْبَيْتِ فَاِذَا مَاتَ هَوَّنَ اللهُ عَلَيْهِ جَوَابَ مُنْكِرٍ وَنَكِيْرٍ وَيَكُوْنُ فِىْ مَقْعَدِ صِدْقٍ عِنْدَ مَلِيْكٍ مُّقْتَدِرٍ.

অর্থ: “যখন কোনো মুসলমান নিজ বাড়িতে ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপন করে তখন সেই বাড়ির অধিবাসীগণের উপর থেকে আল্লাহ পাক অবশ্যই খাদ্যাভাব, মহামারি, অগ্নিকা-, ডুবে মরা, বালা-মুছিবত, হিংসা-বিদ্বেষ, কু-দৃষ্টি, চুরি ইত্যাদি উঠিয়ে নেন। যখন উক্ত ব্যক্তি মারা যান তখন আল্লাহ পাক উনার জন্য মুনকার-নকীরের সুওয়াল-জাওয়াব সহজ করে দেন। আর উনার অবস্থান হয় আল্লাহ পাক উনার সন্নিধানে সিদকের মাক্বামে।” সুবহানাল্লাহ! (আন নি’য়ামাতুল কুবরা)

‘ওসায়িল ফী শরহি শামায়িল’ নামক কিতাবে তিনি আরো বলেন-

قَالَ سُلْطَانُ الْعَارِفِيْنَ الْاِمَامُ جَلالُ الدِّيْنِ السُّيُوْطِىُّ قَدَّسَ اللهُ سِرَّهٗ وَنَوَّرَ ضَرِيْحَهُ فِىْ كِتَابِهِ الُمُسَمّٰى الْوَسَائِلِ فِىْ شَرْحِ الشَّمَائِلِ” مَا مِنْ بَيْتٍ اَوْ مَسْجِدٍ اَوْ مَحَلَّةٍ قُرِئَ فِيْهِ مَوْلِدُ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِلا حَفَّتِ الْمَلٰئِكَةُ ذٰلِكَ الْبَيْتَ اَوِ الْمَسْجِدَ اَوِ الْمَحَلًّةَ صَلَّتِ الْمَلٰئِكَةُ عَلٰى اَهْلِ ذٰلِكَ الْمَكَانِ وَعَمَّهُمُ اللهُ تَعَالٰى بِالرَّحْمَةِ وَالرِّضْوَانِ واَمَّا الْمُطَوَقُّوْنَ بِالنُّوْرِ يَعْنِىْ جِبْرَائيلَ وَمِيْكَائِيْلَ وَاِسْرَافِيْلَ وَعَزْرَائِيْلَ عَلَيْهِمُ السَّلامُ فَاِنَّهُمْ يُصَلُّوْنَ عَلٰى مَنْ كَانَ سَبَبًا لِقَرَائَةِ مَوْلِدِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.

অর্থ: “সুলত্বানুল আরিফীন হযরত জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ‘ওসায়িল ফী শরহি শামায়িল’ নামক কিতাবে উল্লেখ করেন যে, যে কোনো ঘরে অথবা মসজিদে অথবা মহল্লায় ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপন করা হয় সেই স্থানকে অবশ্যই আল্লাহ পাক উনার ফেরেশতাগণ বেষ্টন করে নেন। আর উনারা সে স্থানের অধিবাসীগণের উপর ছলাত-সালাম পাঠ করতে থাকেন এবং আল্লাহ পাক উনাদেরকে স্বীয় রহমত ও সন্তুষ্টির আওতাভুক্ত করে নেন। আর নূর দ্বারা সজ্জিত প্রধান চার ফেরেশতা অর্থাৎ হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম, হযরত মীকাইল আলাইহিস সালাম, হযরত ইসরাফিল আলাইহিস সালাম ও হযরত আযরাইল আলাইহিস সালাম মীলাদ শরীফ তথা বিলাদত দিবস উপলক্ষে ছানা-ছিফত পাঠকারীর উপর ছলাত-সালাম পাঠ করেন।” সুবহানাল্লাহ! (আন নি’য়ামাতুল কুবরা)

এই উপমহাদেশে যিনি হাদীছ শাস্ত্রের প্রচার-প্রসার করেছেন, ইমামুল মুফাসসিরীন ওয়াল মুহাদ্দিছীন ওয়াল ফুক্বাহা হযরত শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিছ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন-

مَنْ عَظَّمَ لَيْلَةَ مَوْلِدِهٖ بِمَاۤ اَمْكَنَهٗ مِنَ التَّعْظِيْمِ وَالاِكْرَامِ كَانَ مِنَ الْفَائزِيْنَ بِدَارِ السَّلامِ.

অর্থ: “যে ব্যক্তি আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ দিবসকে তা’যীম করবে এবং সে উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করবে সে চির শান্তিময় জান্নাতের অধিকারী হবে।” সুবহানাল্লাহ!

ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করার কারণে অর্থাৎ বিলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করায় আবু লাহাব কাট্টা কাফির হওয়া সত্ত্বে¡ও জাহান্নাম থেকে ফায়দা লাভ

আল্লামা হযরত ইবনে হাজার আসকালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ ‘ফতহুল বারী’ কিতাবের ৯ম খ-, ১১৮ পৃষ্ঠায় এবং আল্লামা হযরত বদরুদ্দীন আইনী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার রচিত বিশ্বখ্যাত কিতাব ‘উমদাতুল ক্বারী’-এর ২০ খ- ৯৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন,

وذكر السهيلى ان العباس قال لما مات ابو لهب رايته فى منامى بعد حول فى شر حال فقال ما لقيت بعد كم راحة الا ان العذاب يخفف عنى فى كل يوم اثنين وذلك ان النبى صلى الله عليه وسلم ولد يوم الاثنين وكانت ثويبة بشرت ابا لهب بمولده فاعتقها.

অর্থ: হযরত ইমাম সুহাইলী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উল্লেখ করেন যে, হযরত আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, আবু লাহাবের মৃত্যুর এক বছর পর তাকে স্বপ্নে দেখি যে, সে অত্যন্ত (কঠিন) দুরবস্থায় রয়েছে। সে বললো, (হে ভাই হযরত আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু!) আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নেয়ার পর আমি কোনো শান্তির মুখ দেখিনি। তবে হ্যাঁ, প্রতি সোমবার শরীফ যখন আগমন করে তখন আমার থেকে সমস্ত আযাব লাঘব করা হয়, আমি শান্তিতে থাকি। হযরত আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, আবু লাহাবের এ আযাব লাঘব হয়ে শান্তিতে থাকার কারণ হচ্ছে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ-এর দিন ছিলো সোমবার শরীফ। সেই সোমবার শরীফ-এ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ-এর সুসংবাদ নিয়ে আবু লাহাবের বাঁদী হযরত সুয়াইবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা তিনি আবু লাহাবকে জানালেন তখন আবু লাহাব উক্ত বিলাদত শরীফ-এর খুশির সংবাদ শুনে খুশিতে আত্মহারা হয়ে হযরত সুয়াইবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহাকে তৎক্ষণাৎ আযাদ করে দেয়। সুবহানাল্লাহ! (মাওয়াহিবুল লাদুননিয়াহ ১ম খ-, শরহুয যারকানী ১ম খ-, ২৬০ পৃষ্ঠা)

‘ছহীহ বুখারী শরীফ’-এর দ্বিতীয় খ-ের ৭৬৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-

قال عروة وثويبة مولاة لابى لهب كان ابو لهب اعتقها فارضعت النبى صلى الله عليه وسلم فلما مات ابو لهب اريه بعض اهله بشر حيبة قال له ماذا لقيت قال ابو لهب لم الق بعد كم غير انى سقيت فى هذه بعتاقتى ثويبة.

অর্থ: হযরত উরওয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, হযরত সুয়াইবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা তিনি ছিলেন আবু লাহাবের বাঁদী এবং আবু লাহাব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ-এ খুশি হয়ে উনার খিদমত করার জন্য ওই বাঁদীকে আযাদ করে দিয়েছিলো। এরপর আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে তিনি দুধ পান করান। অতঃপর আবু লাহাব যখন মারা গেলো (কিছুদিন পর) তার পরিবারের একজন অর্থাৎ তার ভাই হযরত আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি স্বপ্নে দেখলেন যে, আবূ লাহাব সে ভীষণ কষ্টের মধ্যে নিপতিত আছে। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার সাথে কিরূপ ব্যবহার করা হয়েছে।’ আবু লাহাব উত্তরে বললো, ‘যখন থেকে আপনাদের কাছ থেকে দূরে রয়েছি তখন থেকেই ভীষণ কষ্টে আছি। তবে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করে তথা খুশিতে আত্মহারা হয়ে বাঁদী সুয়াইবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা উনাকে দু’আঙুলের ইশারায় আযাদ করার কারণে সেই দু’আঙ্গুল হতে সুমিষ্ট ঠা-া ও সুশীতল পানি পান করতে পারছি। (উমদাতুল ক্বারী ২০ খ-, ৯৩ পৃষ্ঠা)

আল্লামা হযরত ইবনু কাছীর রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থের ১ম খ-ের ৩৩২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন,

قال للعباس انه ليخفف على فى مثل يوم الاثنين قالوا لانه لما بشرته ثويبة بميلاد ابن اخيه محمد بن عبد الله اعتقها من ساعته فجوزى بذلك لذلك.

অর্থ: আবু লাহাব হযরত আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে বললো, ‘(হে ভাই!) অবশ্যই এ কঠিন আযাব সোমবার শরীফ-এর দিন লাঘব করা হয়, আল্লামা হযরত সুহাইলী রহমতুল্লাহি আলাইহি ও অন্যান্যরা বলেন, হযরত সুয়াইবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা তিনি আবু লাহাবকে তার ভাতিজা হযরত খাজা আব্দুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার নূর “নূরী আওলাদ” নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ-এর সুসংবাদ দেন তৎক্ষণাৎ সে খুশিতে উনাকে মুক্ত করে দেয়। এই কারণেই আযাব লাঘব হয়ে থাকে। (‘মাছাবাতা বিস সুন্নাহ’ ১ম/৮৩ পৃষ্ঠা।)

এ প্রসঙ্গে আরো উল্লেখ আছে যা বিশ্বখ্যাত ঐতিহাসিক আল্লামা হযরত ইয়াকুব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ‘তারিখী ইয়াকুবী’ গ্রন্থের ১ম খ-, ৩৬২ পৃষ্ঠায় লিখেন-

قال النبى صلى الله عليه وسلم رأيت ابا لهب فى النار يصيح العطش العطش فيسقى من الماء فى نقر ابهامه فقلت بم هذا فقال بعتقى ثويبة لانها ارضعتك.

অর্থ: “নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, আমি আবু লাহাবকে দেখেছি জাহান্নামের আগুনে নিমজ্জিত অবস্থায় চিৎকার করে বলছে, পানি দাও! পানি দাও!! অতঃপর তার বৃদ্ধাঙুলীর গিরা দিয়ে পানি পান করানো হচ্ছে। আমি বললাম, কি কারণে এ পানি পাচ্ছো? আবু লাহাব বললো, আপনার বিলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করে হযরত সুয়াইবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা উনাকে মুক্ত করার কারণে এই ফায়দা পাচ্ছি। কেনোনা তিনি আপনাকে দুধ মুবারক পান করিয়েছেন।”

এ প্রসঙ্গে ‘মাওলাহিবুল লাদুননিয়া’ কিতাবের বিখ্যাত শরাহ ‘শরহুয্ যারকানী’ কিতাবের ১ম খ-ের ২৬১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

قال ابن الجزرى فاذا كان هذا الكافر الذى نزل القران بذمه جوزى فى النار بفرحه ليلة مولد النبى صلى الله عليه وسلم به فما حال المسلم الموحد من امته عليه السلام يسر بمولده ويبذل ما تصل اليه قدرته فى محبته صلى الله عليه وسلم لعمرى انما يكون جزاؤه من الله الكريم ان يدخل بفضله العميم جنات النعيم.

অর্থ: হযরত ইবনুল জাযরী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, “আবু লাহাবের মতো কাট্টা কাফির যার নিন্দায় কুরআন শরীফ-এর আয়াত শরীফ ও সূরা পর্যন্ত নাযিল হয়েছে, তাকে যদি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ-এর রাত্রিতে আনন্দিত হয়ে খুশি প্রকাশ করার কারণে জাহান্নামেও তার পুরস্কার দেয়া হয়ে থাকে তবে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উম্মতের কোনো মুসলমান যদি ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করে তার সাধ্যানুযায়ী টাকা-পয়সা ইত্যাদি খরচ করে তাহলে তাদের অবস্থা কিরূপ হবে? নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা উনার ফযল ও করমে অবশ্যই অবশ্যই তাকে নিয়ামতপূর্ণ জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।” সুবহানাল্লাহ! (মাছাহবাতা বিস সুন্নাহ ১ম খ-, ৮৩ পৃষ্ঠা)

সারা মাস বা বৎসর তথা ক্বিয়ামতব্যাপী দায়িমীভাবে বিলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করে মাহফিল করার অপরিসীম ফাযায়িল ফযীলতসমূহ

বিশ্ব বিখ্যাত সীরাতগ্রন্থ মাওয়াহিবুল লাদুননিয়া কিতাবে উল্লেখ আছে-

ولازال اهل الاسلام يحتفلون بشهر مولده عليه الصلوة واللسلام ويعملون الولائم ويتصدقون فى لياليه بانواع الصدقات ويظهرون السرور ويزيدون فى المبرات ويعتنون بقراءة مولده الكريم ويظهر عليهم من بركاته كل فضل عميم ومما جرب من خواصه انه امان فى ذلك العام وبشرى عاجلة بنيل البغية والمرام فرحم الله امرا اتخذ ليالى شهر مولده المباركة اعيادا (مواهب اللدنية والانوار المحمدية صفحة (۱۹)

অর্থ: “সমগ্র মুসলিম উম্মাহ সুদূর অতীতকাল থেকে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদত শরীফ-এ খুশি প্রকাশ উপলক্ষে মাসব্যাপী সর্বদা মীলাদ মাহফিল উদযাপন করে আসছে। যিয়াফত প্রস্তুত করে লোকদের খাওয়াচ্ছে এবং মাসব্যাপী রাত্রে বিভিন্ন রকমের ছদকা-খয়রাত দিচ্ছে এবং শরীয়তসম্মত আনন্দ ও খুশি প্রকাশ করে আসছে। উত্তম কাজ প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি করে চলছে। উনারা বিশেষ আয়োজনের মাধ্যমে ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষে মাহফিল করে আসছে- যার বরকতে বরাবরই তাদের উপর আল্লাহ পাক উনার সীমাহীন অনুগ্রহ প্রকাশ পাচ্ছে। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ উপলক্ষে মীলাদ শরীফ তথা বিলাদত শরীফ-এর মাহফিলের বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে এটা পরীক্ষিত হয়েছে যে, ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাহফিল তথা অনুষ্ঠানের বরকতে ওই বছর আল্লাহ পাক উনার পক্ষ হতে নিরাপত্তা কায়িম থাকে এবং তড়িৎ গতিতে মনোবাঞ্ছনা পূরণের শুভ সংবাদ বয়ে আনে। অতএব, যিনি বা যারা ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাসের প্রতিটি রাতকে শ্রেষ্ঠতম ঈদের রাত্রে পরিণত করে রেখেছেন উনারা বা উনাদের উপর আল্লাহ পাক উনার খাছ রহমত বর্ষিত হোক।”(মাওয়াহিবুল লাদুননিয়া ওয়াল আনওয়ারুল মুহম্মাদিয়া/১৯ পৃষ্ঠা)

বিশ্ববিখ্যাত সীরাত গ্রন্থ ‘খুতবাতু ইবনি নুবাতা’-এ বর্ণিত রয়েছে,

ولد من لولاه ما خلق الوجود ولا يصور والد ولا مولود ولد يوم الاثنين لاثنى عشر ليلة خلون من الربيع الاول فاصبحت بطحاء مكة ترقص طربا واهتز الحرم فرحا عجبا واستبشرت اهل السموت بولادته وفازت امنة بسعادته وخرت الاصنام على رئوسها وايقنت الكهنة بخزيها وبؤسها ونطق الضب برسالته واقر الذئب بنبوته وجلالته فله النسب الرفيع المشرف فهو محمد بن عبدالله ابن عبد المطلب ابن هاشم سيد بنى عدنان وخير ال حين ربى عند جده يتيما ورضع ثدى حليمة فصارا حليما فمن عظم ليلة مولده بما امكنه من التعظيم والاكرام كان من الفا ئزين بدار السلام.

অর্থ: “বিলাদত শরীফ-এর দিনে এমন এক মহান ব্যক্তির আগমন ঘটেছে, যিনি না হলে কায়িনাতের কিছুই সৃষ্টি হতো না। সৃষ্টি হতো না কোনো পিতার, না কোনো সন্তানের। সেই মহান হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক আগমন বা বিলাদত শরীফ-এর শুভক্ষণে খুশিতে আলোড়িত হয়েছিলো পবিত্র মক্কা শরীফ-এর কঙ্করময় মরুভূমি। মহা উল্লাস আর আনন্দে মেতে উঠেছিলো হারাম শরীফও। উনার বিলাদত শরীফ-এ আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠেছিলেন আসমানের ফেরেশতাকুল। উনার সৌভাগ্যে ধন্য হন হযরত আমিনা আলাইহাস সালাম। উনার আগমনে খান খান হয়ে ভেঙে পড়েছিলো প্রতিমাগুলো। জ্যোতিষীরা বুঝতে পেরেছিলো তাদের লাঞ্ছনা ও দুর্ভাগ্য অনিবার্য। উনার রিসালতের রহস্য জানিয়ে দিয়েছিলো গুঁইসাপ। উনার নুবুওওয়াত ও মহত্ত্বের কথা স্বীকার করেছিলো জঙ্গলের বাঘ। উনার বংশ অতি অভিজাত ও সম্মানিত। তিনি হযরত মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিন হযরত আব্দুল্লাহ আলাইহিস সালাম বিন হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম বিন হযরত হাশিম আলাইহিস সালাম; যিনি ছিলেন আদনান গোত্রের সর্দার। তিনি ইয়াতীম অবস্থায় স্বীয় দাদা হযরত আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম উনার কাছে সসম্মানে লালিত-পালিত হন। উনাকে দুধ পান করান হযরত হালিমা সা’দিয়া আলাইহাস সালাম। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ দিবসকে তা’যীম-তাকরীম করবে এবং সে উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করবে, সে চির শান্তিময় জান্নাতের অধিকারী হবে।” (খুতবাতু ইবনি নুবাতা)

এ প্রসঙ্গে মাওয়াহিবুল লাদুননিয়া কিতাবে আরো উল্লেখ আছে-

اعلم ان ذكر مولد النبى صلى الله عليه وسلم وجميع مناقبه وحضور سماعه سنة روى ان حسانا يفاخر قياما من رسول الله صلى الله عليه وسلم بحضرته والناس يجتمعون لسماعه-

অর্থ: “হে মুসলমানগণ! আপনারা জেনে রাখুন যে, ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আলোচনা ও উনার সমস্ত শান, মান বর্ণনা করা এবং ওই মাহফিলে উপস্থিত হওয়া সুন্নত তথা হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহান আদর্শ। বর্ণিত আছে যে, হযরত হাসসান বিন সাবিত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি ক্বিয়াম অবস্থায় নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উপস্থিতিতে উনার গৌরবগাথা শান-মান ছানা-ছিফত পেশ করতেন, আর লোকেরা তা শুনার জন্য একত্রিত হতেন।” সুবহানাল্লাহ!

উক্ত কিতাবে আরো উল্লেখ আছে-

فمن اراد تعظيم مولد النبى صلى الله عليه وسلم يكفيه هذا القدر ومن لم يكن عنده تعظيم مولد النبيى صلى الله عليه وسلم لو ملئت له الد نيا فى مدحه لم يحرك قلبه فى المحبة له صلى الله عليه الله عليه وسلم.

অর্থ: যে ব্যক্তি ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তাযীম করতে চায় তথা খুশি প্রকাশ করতে চায় তার জন্য উপরোক্ত বর্ণনা যথেষ্ট। আর যে ব্যক্তির নিকট ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তা’যীম নেই তথা সম্মান করে না, সারা দুনিয়া পূর্ণ করেও যদি খুশি প্রকাশ করে উনার প্রশংসা করা হয় তথাপিও তার পাষাণ অন্তর হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুহব্বতে প্রকম্পিত হবে না। (আন নি’য়ামাতুল কুবরা)

হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশির বন্যা নিয়ে উনার আম্মাজান আলাইহাস সালাম উনাকে চারজন জান্নাতী মহীয়সীর সুসংবাদ প্রদান

উল্লেখ্য যে, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হচ্ছেন সমস্ত কায়িনাতবাসীর জন্য বেমেছাল রহমত ও মহান নিয়ামত। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন-

وماارسلناك الا رحمة للعالمين

অর্থ: “হে হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি আপনাকে সমস্ত কায়িনাতের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছি।” (সূরা আম্বিয়া : আয়াত শরীফ ১০৭)

কাজেই কুল-কায়িনাতবাসীর জন্য মহান নিয়ামত ও বেমেছাল রহমত হচ্ছেন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। সে মহান রহমত পেয়ে কুল-মাখলুকাতের কি পরিমাণ খুশি প্রকাশ করা উচিত তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মহান আল্লাহ পাক তিনি রেখেছেন যা নি¤েœাক্ত হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত।

যেমন এ প্রসঙ্গে বিশ্ব সমাদৃত, সর্বজন স্বীকৃত ও সুপ্রসিদ্ধ মীলাদ শরীফ-এর কিতাব “আন নি’য়ামাতুল কুবরা আলাল আলাম ফী মাওলিদি সাইয়্যিদি উলদি আদম” নামক কিতাবে বর্ণিত রয়েছে, হযরত মা আমিনা আলাইহাস সালাম তিনি বলেন-

চারজন মহীয়সী এমন উজ্জ্বল ছিলেন যেনো উনারা চন্দ্র সাদৃশ্য। উনাদের চারদিকে আলো আর আলো। আবদে মানাফ বংশের সাথে সাদৃশ্য রাখেন উনারা।

অতঃপর উনাদের প্রথমজন তিনি এগিয়ে এলেন এবং তিনি বললেন, হে হযরত আমিনা আলাইহাস সালাম! আপনার মতো কে আছে? আপনি যে রবীয়া ও মুদ্বার গোত্রের সাইয়্যিদ উনাকে রেহেম শরীফ-এ ধারণ করেছেন। অতঃপর তিনি আমার ডান দিকে বসলেন। তখন আমি উনাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কে? তিনি বললেন, ‘আমি হযরত হাওয়া আলাইহাস সালাম। মানবজাতির মাতা।’

অতঃপর দ্বিতীয়জন এগিয়ে এলেন। তিনি বললেন, হে হযরত আমিনা আলাইহাস সালাম! আপনার মতো কে আছেন? আপনি তো রেহেম শরীফ-এ ধারণ করেছেন পূতপবিত্র জ্ঞান-ভা-ারের রহস্যকে, রতœরাজির সাগরকে, নূরের ঝলককে, সুস্পষ্ট তত্ত্বজ্ঞানী উনাকে। অতঃপর তিনি বাম দিকে উপবেশন করলেন। তখন আমি উনাকে বললাম, আপনি কে? তিনি বললেন, ‘আমি হযরত সারাহ আলাইহাস সালাম। হযরত ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সালাম উনার আহলিয়া।’

অতঃপর তৃতীয়জন এগিয়ে এলেন এবং তিনি বললেন, হে হযরত আমিনা আলাইহাস সালাম! আপনার তো কোনো তুলনাই হয় না। আপনি যে চির প্রত্যাশার হাবীবে খোদা উনাকে রেহেম শরীফ-এ ধারণ করেছেন। যিনি প্রশংসা ও ছানা-ছিফতের লক্ষ্যস্থল। অতঃপর তিনি আমার পিঠের দিকে বসলেন। আমি বললাম, আপনি কে? তিনি বললেন, ‘আমি হযরত আছিয়া বিনতে মুসাহিম আলাইহাস সালাম।’

এরপর চতুর্থজন এগিয়ে এলেন। তিনি অন্যদের তুলনায় বেশি উজ্জ্বলতার অধিকারিণী ছিলেন। তিনি বললেন, হে হযরত আমিনা আলাইহাস সালাম! আপনার সমকক্ষ কেউই নেই। আপনি রেহেম শরীফ-এ ধারণ করেছেন অকাট্য দলীলের অধিকারী ব্যক্তিত্বকে, যিনি মু’জিযা, আয়াত ও দালায়িলের অধিকারী। যিনি যমীন ও আসমানবাসীদের সাইয়্যিদ। উনার উপর আল্লাহ পাক উনার সর্বোত্তম ছলাত এবং পরিপূর্ণ সালাম। তারপর তিনি আমার নিকটে বসলেন আর আমাকে তিনি বললেন, হে হযরত আমিনা আলাইহাস সালাম! আপনি আমার উপর হেলান দিন। আমার উপর পূর্ণ আস্থা রাখুন। আমি উনাকে জিজ্ঞেস করলাম। আপনি কে? তিনি বললেন, ‘আমি হযরত মারইয়াম বিনতে ইমরান আলাইহাস সালাম। আমরা আপনার সেবিকা এবং সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে গ্রহণকারিণী।’ সুবহানাল্লাহ!

এই যে আসমান-যমীন, বেহেশতে সর্বত্রই চলছে বিলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশির বন্যা তা অনন্তকাল পর্যন্ত চলবে ইনশাআল্লাহ!

নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া উনার বিলাদত শরীফ উপলক্ষে বেহেশতের হুর-পরী, এমনকি কুল-কায়িনাতের সকলেই খুশি প্রকাশ করেছিলেন, এখনো করছেন এবং ভবিষ্যতেও করতে থাকবেন। অতএব জিন-ইনসানের উচিত তারাও যেনো অনন্তকাল ধরে খুশি প্রকাশ করে

মহান আল্লাহ পাক তিনি নিজেই সমস্ত ফেরেশতাকুল উনাদেরকে নিয়ে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শান-মান ও খুশি প্রকাশে আদি হতে অনন্তকাল ব্যাপী ছলাত-সালাম পাঠে মশগুল এবং জিন-ইনসানসহ সমস্ত সৃষ্টিকুলকে স্বীয় হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উপর অনন্তকাল ব্যাপী ছলাত-সালাম, তাসবীহ-তাহলীল, ছানা-ছিফত পাঠে নিয়োজিত রেখেছেন তথা ফরযে আইন করে দিয়েছেন, যা সূরা ফাতহ ৮-৯ এবং সূরা ইউনূস ৫৭-৫৮ আয়াত শরীফ দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক তিনি বলেন-

كل قد علم صلاته وتسبيحه

অর্থ: “প্রত্যেক মাখলুকাতেই তার ছলাত ও তাসবীহ তথা ছলাত, সালাম, তাসবীহ-তাহলীল, ছানা-ছিফত পাঠের পদ্ধতি সম্পর্কে যথার্থভাবে অবগত। অর্থাৎ কায়িনাতের প্রত্যেকেই হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে পেয়ে খুশি প্রকাশার্থে দায়িমীভাবে ছলাত ও সালাম, তাসবীহ-তাহলীল, ছানা-ছিফত পাঠে মশগুল।” সুবহানাল্লাহ! (সূরা আন নূর : আয়াত শরীফ ৪১)

এ প্রসঙ্গে আল্লামা হযরত হাইছামী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার বিশ্বখ্যাত কিতাব ‘আন নি’য়ামাতুল কুবরা আলাল আলাম’-এ উল্লেখ আছে, হযরত আমিনা আলাইহাস সালাম তিনি বললেন, “নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশির সংবাদ নিয়ে দলে দলে ফেরেশতাগণ আগমন করেছিলেন। তখন আমি আমার গৃহের দিকে তাকালাম, আমি দেখতে লাগলাম, দীর্ঘ বাহুবিশিষ্ট জনেরা আমার নিকট নানান ভাষায় বৈচিত্র্যপূর্ণ মহা আনন্দের ও সুসংবাদের বাণী শুনাচ্ছেন। আমি সে সময় লক্ষ্য করলাম, দলে দলে ফেরেশতাগণ উনারা আমার ডানে-বামে উড়ছেন। তখন আল্লাহ পাক তিনি হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম উনাকে আদেশ করলেন, হে জিবরীল আলাইহিস সালাম! রূহসমূহকে ‘শারাবান তহুরা’ পাত্রের নিকট শ্রেণীবদ্ধ করুন। হে রিদওয়ান! জান্নাতের হুর-গেলোমানকে নতুন সাজে সজ্জিত করুন। আর পবিত্র মেশকের সুগন্ধি ছড়িয়ে দিন। সারা মাখলূকাতের যিনি মহান রসূল, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আগমণে তথা ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষে।” হে হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম! বিছিয়ে দিন নৈকট্য ও মিলনের জায়নামায সেই মহান রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্য, যিনি অধিকারী নূরের, উচ্চ মর্যাদার এবং মহা মিলনের। হে হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম! দোযখের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা হযরত মালিক আলাইহিস সালাম উনাকে আদেশ করুন, তিনি যেনো দোযখের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেন। জান্নাতের তত্ত্বাবধায়ক ফেরেশতা হযরত রিদওয়ান আলাইহিস সালাম উনাকে বলুন, তিনি যেনো জান্নাতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দেন। হে হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম! হযরত রিদওয়ান আলাইহিস সালাম-উনার অনুরূপ পোশাক পরিধান করুন এবং সুসজ্জিত হয়ে কাছের ও দূরের সকল ফেরেশতা সহকারে যমীনের বুকে গমন করুন। অতঃপর আসমান-যমীনের চারপাশে ঘোষণা দিন, সময় ঘনিয়ে এসেছে, মুহিব ও মাহবূবের মিলনের, তালিব ও মাতলূবের সাক্ষাতের। অর্থাৎ আল্লাহ পাক উনার সাথে উনার হাবীব পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার যে মি’রাজ হবে তার সময় নিকটবর্তী হলো উনার বিলাদত শরীফ-এর মাধ্যমে।” সুবহানাল্লাহ!

অতঃপর হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি হুকুম বাস্তবায়ন করলেন, যেমনটি আল্লাহ জাল্লা শানুহু তিনি হুকুম করলেন। এক জামায়াত ফেরেশতা উনাদেরকে মক্কা শরীফ-এর পাহাড়ে দায়িত্ব দিলেন। উনারা হারাম শরীফ-এর দিকে নজর রাখলেন। উনাদের পাখাসমূহ যেনো সুগন্ধিযুক্ত সাদা মেঘের টুকরা। তখন পাখিসমূহ তাসবীহ পাঠ করতে লাগলো এবং উন্মুক্ত প্রান্তরে বনের পশুগুলো সহানুভূতির ডাক, আশার ডাক দিতে লাগলো। এ সবকিছুই সেই মহান মালিক জলীল জাব্বার আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন উনার আদেশ মুতাবিক হলো।

হযরত আমিনা আলাইহাস সালাম তিনি বলেন, অতঃপর আল্লাহ পাক তিনি চোখের পর্দা অপসারিত করলেন। আমি দেখতে পেলাম, শাম দেশের বছরা নগরীর প্রাসাদসমূহ। আমি দেখলাম, তিনটি পতাকা। একটি পতাকা পূর্ব প্রান্তে, আরেকটি পতাকা পশ্চিম প্রান্তে এবং তৃতীয়টি কা’বা শরীফ-এর ছাদে। আমি আরো দেখলাম, পাখিদের একটি দল, যে পাখিদের চক্ষুগুলো স্বর্ণাভ, ডানাগুলো বৈচিত্র্যময় রঙ-বেরঙের ফুলের মতো। সেগুলো আমার কক্ষে প্রবেশ করলো মণিমুক্তার মত। এরপর উক্ত পাখিগুলো আমার চারপাশে আল্লাহ পাক উনার ছানা-ছিফত করতে লাগলো। আমি উন্মীলিত রইলাম এ অবস্থায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আর ফেরেশতাগণ আমার নিকট দলে দলে আসতে লাগলেন। আর উনাদের হাতে ছিল ‘আগরদান’ স্বর্ণাভ ও রৌপ্য নির্মিত। আর উনারা সুগন্ধির ধূম্র ছড়াচ্ছিলেন। সেই সাথে উনারা উচ্চ কণ্ঠে সম্মানিত ও মর্যাদাবান হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি ছলাত-সালাম পাঠ করছিলেন। উনাদের কণ্ঠে সৌজন্যতার ও মহানুভবতার ভাব স্পষ্ট ছিল।

হযরত আমিনা আলাইহাস সালাম তিনি বলেন, চন্দ্র আমার মাথার উপর চলে এলো, তাঁবু মাথার উপর থাকার মতো। আর তারকারাজি আমার মাথার উপর সদৃশ মোমবাতির ন্যায়। সে অবস্থায় আমার নিকট ছিল দুধের ন্যায় শুভ্র সুগন্ধিময় পানীয়, যা ছিলো মধুর চেয়ে মিষ্ট এবং বরফের চেয়ে বেশি ঠা-া। তখন আমার খুব পিপাসা লাগছিলো। আমি তা গ্রহণ করলাম ও পান করলাম। এর চেয়ে অধিক কোনো সুপেয় পানীয় আগে কখনো পান করিনি। অতঃপর আমা হতে প্রকাশিত হলো এক মহিমান্বিত নূর। সুবহানাল্লাহ!

উক্ত বর্ণনা থেকে প্রতিভাত হলো আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ কালে স্বয়ং আল্লাহ পাক উনার হুকুম বা নির্দেশে খুশি প্রকাশ করেছিলেন ফেরেশতাকুল, খুশি প্রকাশ করেছিলেন জান্নাতের অধিবাসীগণ, এমনকি খুশি প্রকাশ করেছিলো বনের পশু-পাখিরাও। খুশি প্রকাশ করে ছানা-ছিফত বর্ণনা করা হয়েছিলো এবং পাঠ করা হয়েছিলো ছলাত-সালাম ও তাসবীহ-তাহলীল।

কাজেই, উম্মতের প্রতিও আল্লাহ পাক উনার সে একই নির্দেশ হলো, তারা যেনো হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ উপলক্ষে যথার্থভাবে খুশি প্রকাশ করে।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ করেন,

قل بفضل الله وبرحمته فبذالك فليفرحوا.

অর্থ: “হে আমার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি বলে দিন, তোমরা মহান আল্লাহ পাক উনার দয়া, ইহসান ও রহমত (হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে পেয়ে) উনার জন্য যথাযথ ঈদ উদযাপন তথা খুশি প্রকাশ করো। (তোমরা যতো কিছুই করোনা কেনো) তিনিই হচ্ছেন সমগ্র কায়িনাতের জন্য সবচেয়ে বড় ও সর্বোত্তম নিয়ামত।” (সূরা ইউনুস : আয়াত শরীফ ৫৮)

উপরোক্ত কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ এবং সর্বজনমান্য বিশ্বখ্যাত কিতাবসমূহের অসংখ্য দলিলের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ উপলক্ষে জান্নাত ও জান্নাতী হূর-গেলমান থেকে শুরু করে আসমান-যমীনসহ সমস্ত কায়িনাতকে অপরূপ বৈচিত্র্যে সাজিয়ে সমস্ত সৃষ্টিকে নিয়ে মহান আল্লাহ পাক তিনি নিজেই ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপন ও খুশি প্রকাশ করেছেন, করছেন ও অনন্তকাল ব্যাপী করতে থাকবেন। সুবহানাল্লাহ! তাহলে সেই মহান ঈদ বা খুশি পালন জিন-ইনসানদের জন্য কত বড় শ্রেষ্ঠতম ঈদ তথা খুশি! তা কস্মিনকালেও মাখলুকাতের পক্ষে বর্ণনা করে শেষ করা সম্ভব হবে না। কাজেই জিন-ইনসানসহ সমস্ত কায়িনাতবাসীর জন্য অপরিহার্য দায়িত্ব-কর্তব্য হচ্ছে অনন্তকালব্যাপী সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ, সাইয়্যিদে ঈদে আ’যম, সাইয়্যিদে ঈদে আকবর তথা সকল ঈদের সেরা বা শ্রেষ্ঠতম ঈদ হচ্ছে ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করা, উদযাপনে যথাযথ খুশি প্রকাশ করা যা কুল-মাখলুকাতের সকলের জন্য ফরযে আইন ও নাজাতের একমাত্র সোপান।

এ কারণেই বর্তমান যামানার মহান মুজাদ্দিদ, মুজ্জাদ্দিদে আ’যম, হাবীবে আ’যম, গাউছে আ’যম, ফারূকে আ’যম, হুজ্জাতুল ইসলাম, আওলাদুর রসূল, সাইয়্যিদুনা ইমাম রাজারবাগ শরীফ-এর মামদূহ হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী তিনি তাজদীদ করে ফতওয়া দেন যে, “সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ, সাইয়্যিদে ঈদে আ’যম, সাইয়্যিদে ঈদে আকবর তথা সকল ঈদের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও সেরা ঈদ পবিত্র ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম; যা পালন করা ফরযে আইন সর্বোপরি নাজাত ও শাফায়াত লাভের সর্বোত্তম উপায়।”

মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাদেরকে আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবল্লাহু হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ-এর যথার্থ শান-মান ও মর্যাদাকে অনুধাবন করে পবিত্র ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষে জীবনের সর্বশক্তি, সামর্থ্য, টাকা-পয়সা এবং জান-মাল দিয়ে খুশি প্রকাশ করার তাওফীক দান করুন। আমীন!

Designed and Developed bywww.12hosthub.com© 2015 islamicdocuments.com . All Rights reserved.